Home » কৃষি খবর » ‘আমরা গরিব’-গরিবের আবার কিসের মে দিবস
‘আমরা গরিব’-গরিবের আবার কিসের মে দিবস
‘আমরা গরিব’-গরিবের আবার কিসের মে দিবস

‘আমরা গরিব’-গরিবের আবার কিসের মে দিবস

এপ্রিলের শেষদিনটি ছিলো সোমবার (৩০ এপ্রিল)। ভোর থেকেই পড়তে থাকে মুষলধারে বৃষ্টি। দুপুরের একটু আগে ছাড় দেয় বৃষ্টিপড়া। আরো একটু সময় গড়িয়ে গেলে দেখা মেলে সূর্য মামার। তখন বিকেলে গড়িয়ে সন্ধ্যা। চারদিকে রাতের আবহ বিরাজ করছিলো। কিন্তু তবুও ধানের ক্ষেতে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছিলেন কিছু দলবদ্ধ শ্রমিকরা। তখনও তারা ধান কাটা ও মাড়াই নিয়ে খুবই ব্যস্ত।

তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন আব্দুস সালাম। তিনি পেশায় শ্রমিক। কাজ করেন দিনমজুরের। বর্তমানে ধান কাটা এবং মাড়াই কাজে অত্যান্ত ব্যস্ত তিনি। তার নেতৃত্বে রয়েছেন মোট ১৭ জন শ্রমিক। তিনি তাদের সকলের সর্দার। তিনি থাকেন পাবনার তালগাছী গ্রামটিতে। জীবিকার সন্ধানে চলে এসেছেন বগুড়ায়। সাধুবাড়ী গ্রামের গৃহস্থ শহিদুল ইসলামের জমির ধান কাটা মাড়াইয়ের কাজ করছেন তারা।

ঝড়-বৃষ্টি-শিলাবৃষ্টি মাথায় নিয়েই কাজ করে চলেছেন এসব শ্রমিকরা। শুধু দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের যোগান দিতেই এতো কষ্টের জীবন বইছেন তারা। প্রায় ৩০ বিঘা জমির ধান কাটা মাড়াইয়ের কাজ সম্পন্ন করে দিতে চুক্তিবদ্ধ তারা। ৩ বেলা খাওয়া থাকা গৃহস্থের । প্রতিবিঘা জমির ধান কাটা মাড়াইয়ের শেষে পাবেন ৩ হাজার টাকা। সেই অনুযায়ী দিনরাত এক করে কাজও করছিলেন তারা। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় প্রতিকূল আবহাওয়া। পাঁচদিনের কাজ সাতদিনেও শেষ করতে পারেনি তারা। ফলে লাভের আশায় গুঁড়েবালি। এরপরও চুক্তি মোতাবেক কাজ শেষ করে অন্য গৃহস্থের দ্বারস্থ হতে হবে।

মহান মে দিবস সম্পর্কে শ্রমিক সর্দার আব্দুল সালামের কাছে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, গরিবের আবার কিসের মে দিবস। শরীরের ঘাম ঝরালে পেটে ভাত যায়। নচেৎ অর্ধাহারে-অনাহারে দিন পার করতে হয়। তাই আমার মত গরিবদের এসব দিবস-টিবস নিয়ে ভাবার সময় কই। আর দিবসটি সম্পর্কে তেমন ভাল জানিও না।

একই কাজের জন্য দিনাজপুরের বীরগঞ্জ থেকে বগুড়ায় এসেছেন লোকমান সর্দার। তার দলে রয়েছে ৭ জন শ্রমিক। একই চুক্তি মোতাবেক গৃহস্থ আনিছুর রহমান ঠান্ডুর ৭ বিঘার জমির ধান কাটা মাড়াইয়ের কাজ করছেন তারা।

পহেলা মে সম্পর্কে প্রশ্ন করলে লোকমান সর্দার জানান, আমরা গরিব মানুষ। দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করি। মে দিবসের কথা মুখে মুখে শুধু শুনেই আসছি। কিন্তু নিজে কোন কিছু জানি না। জানার কোনো প্রকার চেষ্টাও করি না। কারণ হাঁড়ভাঙা খাটুনিতেই জোড়াতালিতে চলে আমাদের মত শ্রমিকদের সংসার। তাহলে আমাদের মত মানুষদের এসব দিবস নিয়ে ভাবার সময় কোথায়।

প্রত্যেক বছর মহান মে দিবস আসে এবং চলে যায়। গোটা বিশ্বের মতো জমকালো ও যথাযথ মর্যাদায় বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হয়। কিন্তু যাদের জন্য এতো আয়োজন তাদের কী কিছু আসে যায়। অধিকার আদায়ে দিবসটি কী তাদের জন্য আজও কার্যকর তেমন কোন ভূমিকা রাখতে পারছে না। প্রশ্নের উত্তর কিন্তু শ্রমিক সর্দার আব্দুস সালাম ও লোকমানের আলাপচারিতায় অনেকটা পরিষ্কার।

ফিরোজ সর্দারের দলে রয়েছে ১৪ জন শ্রমিক। আর ১৫ জন শ্রমিক রয়েছে আজিম সর্দারের দলে। তারাও পাবনার তালগাছী গ্রামের বাসিন্দা। পেটের দায়ে সারা বছর তারা এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ছুটে বেড়ানোর কাজ করেন। বর্তমানে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী নন্দীগ্রাম উপজেলার সরিষাবাজ গ্রামে ২ জন গৃহস্থের ধান কাটা মাড়াইয়ের কাজ করছেন তারা।

আলতাফ হোসেন নামের এক শ্রমিক বলেন, দিন হাজিরার কাজ না। চুক্তির কাজ। এ কাজের নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। সেই কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে আবহাওয়া ভাল থাকলে অনেক দিন রাত পর্যন্ত কাজ করি। যত তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করতে পারবো তত তাড়াতাড়ি আরেক গেরস্থের কাজ ধরতে পারবো। এতে হয়তো আয় কিছুটা বাড়ানো সম্ভব হবে।

আজিম সর্দার বলেন, শুধু ক্ষুধার জ্বালায় পাবনা থেকে বগুড়ায় ছুটে এসেছি। কিভাবে দু’টো টাকা বেশি আয় করা যায়। তাই একটু বেশি আয়ের আশায় ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কষ্ট করেই কাজ করছি। এছাড়া পহেলা মে সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। আর জেনেও লাভ কী। গরিবের ঘরে জন্ম নিলে কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করতে হবে’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: