Home » খেলাধুলা » অ্যাথলেটিকস » কী কারণে একজন ভারতীয়র বাংলাদেশি হয়ে ওঠা?
কী কারণে একজন ভারতীয়র বাংলাদেশি হয়ে ওঠা
কী কারণে একজন ভারতীয়র বাংলাদেশি হয়ে ওঠা

কী কারণে একজন ভারতীয়র বাংলাদেশি হয়ে ওঠা?

বার বার ব্যার্থতার কারণে সেই ভারতীয় ব্যাক্তিটির আর ইচ্ছে হচ্ছিল না বাংলাদেশে আসার!’
সেই ১৪ বছর আগে শীতের এক সকালে প্রথমবারের মতো ঢাকায় পা রেখেছিলেন নিশিত দাস নামের এক ভারতীয়। এক মাস পরেই কলকাতা ফিরে যেতে হয়েছিল তাঁকে। তখনই মাথায় এসেছিল সে ভাবনা

এমন ভাবনার মানুষটিই কিনা এখন দিব্যি সংসার পেতে বসেছেন বাংলাদেশে। তিরধনুকের সারথি হিসেবে হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশেরই একজন। দেশ নিয়ে বুনছেন স্বপ্ন। কিসের টানে বা কোন কারণে ভারতীয় বাঙালির বাংলাদেশি হয়ে ওঠা?  যার পিছনে লুকিয়ে আছে এই কাহীনি।

সেই ২০০৪ সাল। আর্চারির সঙ্গে তখনো বাংলাদেশের মানুষের পরিচয় হয়ে ওঠেনি। আজকের আর্চারি ফেডারেশন তখন অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে পরিচিত। ১৪ বছর আগে খেলাটির দূত হয়েই যেন ঢাকায় এসেছিলেন নিশিত। তাঁর হাতে খেলোয়াড় মাত্র ছয়জন। আর খেলার অ্যারো (তির) মাত্র চারটি! রমনার এক হোটেলে মাথা গুঁজে ওই স্বল্প পুঁজি নিয়েই শুরু হলো নিশানা ভেদ করার মিশন। যেন পাথরে ফুল ফোটানোর যুদ্ধ!

কিন্তু আশাহত হয়ে এক মাস পরেই কলকাতা চলে গেলেন নিশিত। আবার বুঝিয়ে তাঁকে ঢাকা নিয়ে আসা হলো, এবারও টিকলেন মাত্র তিন মাস। এবারও কোনো আশার আলো দেখতে না পেয়ে আবারও ফিরে গেলেন কলকাতায়। পাঁচবার ভারতীয় চ্যাম্পিয়নের মাথায় ঘুরপাকও খেয়েছিল, ‘আর বাংলাদেশ নয়!’

কিন্তু বাংলাদেশে আর্চারির বীজ বোনা চপল আহমেদ কোনো কিছুতেই হার মানতে রাজি নন। নিশিতের বড় ভাই সোমেন দাসকে যিনি  ভারতের জাতীয় আর্চারি দলের কোচ) অনুরোধ করে আবারও ঢাকায় নিয়ে আসা হলো নিশিতকে। কলকাতা থেকে এটাই তাঁর শেষবারের মতো বাংলাদেশে আসা। কেননা, এরপর যতবারই কলকাতা গিয়েছেন, তাঁর নাকি মনে হয়েছে, ‘বাংলাদেশ থেকে কলকাতা যাচ্ছি।৪০ বছর বয়সী নিশিতের এখানেই বাংলাদেশি হয়ে ওঠার শুরু

এরপর ২০০৫ সালে অনুশীলনের জন্য কিছু ছেলেমেয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন রাঙামাটি। পার্বত্য অঞ্চলে অনুশীলনের পাশাপাশি নিজে রান্না করে খেয়েছেন, খাইয়েছেন শিষ্যদেরও। রাঙামাটি থেকে ফিরে নতুন আবাস হয়েছিল কমলাপুরের শহীদ সিপাহি মোস্তফা স্টেডিয়ামে। সেখানে কিছুদিন অনুশীলন করার পরই দিল্লিতে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশ, যা আর্চারিতে বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট

তারপর থেকে গল্প শুরু।পরের বছরেই কলম্বোয় অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে ব্রোঞ্জ জয় করে আর্চারি। সেবারই যেন পায়ের নিচে মাটি পেল খেলাটি। নিশিতও যেন পেয়ে গেলেন রসদ। এরপর নিশিতের হাত ধরে শুধু তরতর করে শুধু এগিয়ে যাওয়া। চলতি বছর জাতীয় দলের দায়িত্ব ছাড়ার আগে নিশিতের অধীনে বাংলাদেশ সোনা জিতেছে ১২টি। তাঁর ছাত্ররাই এখন হয়ে উঠেছেন দেশের আর্চার কোচ, যা নিয়ে নিশিতের কণ্ঠে গর্ব, ‘ছোট অবস্থায় যে ছেলেগুলোকে পেয়েছিলাম, তারাই এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কোচ হয়ে গিয়েছে। আর্চারিকে অবলম্বন করে সম্মানের সঙ্গে জীবন যাপন করছে। একজন কোচের জন্য বিষয়গুলো খুবই গর্বের।

তিরধনুকের সঙ্গেই কেটে যাচ্ছিল জীবন। এরই মাঝে তাঁর হ্রদয়ে নিশানা লাগিয়েছেন খুলনার মেয়ে শিলা হালদার। বাংলাদেশি এই মেয়ের সঙ্গেই ২০০৯ সালে সংসার পেতে বসা। পরের বছরই তাঁদের কোলজুড়ে আসে মেয়ে নন্দিনী হালদার। সব মিলিয়ে খুলনার শ্যামবাজারে সুখের সংসার

মেঘে মেঘে বেলা গড়িয়ে বাংলাদেশে কাটিয়ে দিয়েছেন প্রায় ১৪ বছর। দীর্ঘ এই সময়ে সবুজ শ্যামল দেশটা জায়গা করে নিয়েছে নিশিতের হৃদয়ে, ‘আমার কাছে কলকাতাও যেমন ঠিক বাংলাদেশটাও। কলকাতাকেও যেমন ভালোবাসি, বাংলাদেশকেও তেমন ভালোবাসি। কোনো কিছুতেই আর পার্থক্য দেখি না।

তবে বাংলাদেশ আর আর্চারির জন্য নিশিতকে নাকি হারাতেও হয়েছে অনেক কিছু। ২০০৯ সালে অসুস্থ হয়ে পড়েন তাঁর বাবা। কিন্তু জাতীয় দলের ক্যাম্প চলায় যাওয়া হয়নি তাঁর। নিশিতকে কলকাতায় ফিরতে হয়েছিল বাবার মৃত্যু সংবাদে, ‘আর্চারি আমাকে অনেক দিয়েছে। আবার হারিয়েছিও অনেক। বাবা অসুস্থ থাকায় সময় তাঁর সঙ্গে থাকতে পারলাম না। ছেলের দায়িত্বটা পালন করতে পারিনি।

বাংলাদেশের জন্য নিশিতের এমন ত্যাগের গল্প আছে অনেক। বাংলাদেশও সে দায় মিটিয়ে যাচ্ছে ভালোবাসা দিয়েআর কারনেই একজন ভারতীয়র বাংলাদেশী হয়ে ওঠা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: