Home » খেলাধুলা » ক্রিকেট » ক্রিকেটে নতুন টেম্পারিং এর গুঞ্জন

ক্রিকেটে নতুন টেম্পারিং এর গুঞ্জন

আঠারো শতকে ব্যাঙ্গমূলক একটা ছবি একে অনেক সুনাম অর্জন করেছিলেন জন কোলেট।সময়ের  সেরা ‘আইকনিক’ ছবিটা তাঁর—‘মিস উইকেট অ্যান্ড মিস ট্রিগার (১৭৭৮)’। মিস ট্রিগার হাসি মুখে তাঁর বন্দুক আর তিনটি মৃত পাখি দেখাচ্ছেন মিস উইকেটকে। ওপরদিকে পরা মিস উইকেট তাঁর ব্যাট দিয়ে দুই স্টাম্পের বেলস ঠিক রাখতে ব্যস্ত। ছবিতে কোনো পুরুষ নেই, অথচ খেলাটা ক্রিকেট!
ভাবছেন, তখন ক্রিকেটে মেয়েদের উচু চোখে দেখা হতো তাই না। কিন্তু সব সময় কি আর হতো? এরই মধ্যে পুরুষ কিন্তু মেয়েদের ক্রিকেট থেকে  আন্ন্দ নিয়েছে বিভিন্ন ঝামেলার মাছেও।। কোলেটের সেই ছবির দেড় শ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর এক  চারটি ক্রিকেট ম্যাচের ঘটনা শুনুন—
২৯ অক্টোবর, ১৯৩২। মেলবোর্নে ‘গ্রেড বি’ ম্যাচে মুখোমুখি দুই নারী দল—ক্লিফটন হিল ও ফুটস্ক্যারি। তেমন গুরপ্তপূর্ণ কোনো ম্যাচ ছিল না। অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম দ্য আর্গাস তে  লিখেছিল, ‘ফুটস্ক্যারি-ই ম্যাচটা জিতেছিল। ৪০ রানের জবাবে প্রথম ইনিংসে তারা  ৭০ রান করেছিল।’ সেই ম্যাচটা দুই ইনিংসের ছিল কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি (কিন্তু প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে ‘ফার্স্ট ইনিংস’)।
তবে আসল ঘটনা ম্যাচের ফলাফল  নিয়ে নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সেদিন প্রচণ্ড বাতাস বইছিল। স্টাম্পের ওপর থেকে বারবার বেল পড়ে যাচ্ছিল। আম্পায়াররা (দুজনই পুরুষ) ভাবলেন, বিশেষভাবে বিষয়টা সমাধান করতে হবে। চুইংগাম দিয়ে বেল দুটি  তারা স্টাম্পের সঙ্গে আটকে দিলেন!
অনেকেই বলবে  এটা তো ‘বেলস টেম্পারিং’! কিন্তু তখন ক্রিকেটে আম্পায়ারদের সেই ‘অভিনব পদ্ধতি’ কি ক্রিকেটটের বিরুদ্ধে? ১৮৮৪ সালে অনুমোদিত ক্রিকেট রুলে কিন্তু ‘বেলস টেম্পারিং’য়ের বিষয়ে কোনো কিছুর উল্লেখ নেই। পরে সেই বিধিমালার ১৬টি সংশোধনীতেও (সর্বশেষ ১৯৩৭ সালে) ‘বেলস টেম্পারিং’ নিয়ে কোনো বিষয় জড়িত হয়নি।
তবে সেটা ১৯৪৭ সালে প্রবর্তিত হয় ৮.৩ ধারায়। যাহাতে বলা  ‘প্রচণ্ড বাতাস থাকলে আম্পায়ারদ্বয়ের সম্মতি নিয়ে দুই অধিনায়ক বেল ছাড়াই খেলতে পারেন।’ অর্থাৎ ১৯৩২ সালের তখন কেউ যে ‘বেলস টেম্পারিং’ করতে পারেন, তা নিয়ে খেলাটির মোরলরাও ভাবেননি। কোনো আইন তো ছিল না? ওই ঘটনার আগেও বেল নিয়ে ‘পরকিল্পনা হয়েছে। ক্রিকেট ঐতিহাসিক জেরাল্ড ব্রডরিব তাঁর ‘নেক্সট ম্যান ইন’ বইয়ে লিখেছেন, ১৯০২ সালের দিকেও ‘লোহার বেল’ আর ‘কাদামাটির বেল’ ব্যবহার করা হয়েছে। সেই ১৯৩২ সালের ম্যাচে ফুটস্ক্যারির এক ব্যাটসম্যান ২৬ রান করেছিলেন। ৩ রানের মাথায় তিনি একবার ‘বোল্ড’ হয়েও হননি! মানে, বল স্টাম্পে আঘাত হানলেও বেল পড়েনি। এরপর একবার স্টাম্পিংয়ের শিকার হয়েছেন। কিন্তু আবারও সেই একই কাণ্ড—উইকেটরক্ষক স্টাম্প ভেঙেছেন কিন্তু বেল পড়েনি! প্রথমবার আউট হওয়ার পর ২৩ রান করেছিলেন সেই ব্যাটসম্যান। এই ২৩ রান কেটে ফেললে ফুটস্ক্যারি কিন্তু ম্যাচটা জিততে পারত না, টাই হতো!

ক্লিফটন হিলের খেলোয়াড়েরা বিষয়টা বুঝতে পেরে তাঁরা প্রতিবাদ জানালো। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হলো ম্যাচটা আবারও খেলতে হবে। কিন্তু এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে (২৬ নভেম্বর) ভিক্টোরিয়ান উইমেন ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন জানিয়ে দিল, ‘অ্যাসোসিয়েশনের সংবিধানে এ ধরনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো আইন নেই।’
পাঁচ দিন পর সিডনির দ্য সান সংবাদমাধ্যমের জনপ্রিয় ‘দ্য মুভিং পিকচার শো’ কলামে এ নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক লেখা প্রকাশ হয়। সেখানে পুরুষ কল্পচরিত্র ‘পিটার’ নারী কল্পচরিত্র ‘অ্যামেলিয়া’কে উদ্দেশ করে বলে, ‘আমার ভালোবাসা, কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছি, তুমি যেন কখনো ক্রিকেটে আগ্রহী না হও। বলতে খারাপ লাগছে, তোমাদের মতোই একজন (আমার প্রিয়) তার বেল যেন না পড়ে, সে জন্য চুইংগাম ব্যবহার করেছে!’
তার কথার জবাবে অ্যমেলিয়া বলে পিটার তোমাকে মেনে নিতে হবে এই বিশ্বসংসারে যত গ্রেস, ট্রাম্বল, জার্ডিন, ব্র্যাডম্যান আছেন, তাঁদের কারও মাথায়ই এমন কৌশল আসত না। এটা বুঝিয়ে দেয় যে আমরা দুর্বল নারীরা   কতটা  (বুদ্ধিবৃত্তিক) এবং বিপজ্জনক হতে পারি।
অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের সেই বিষয় নিয়ে লিখতে দ্য টাইমস একটু দেরি করেছিল।বিষয়টা ব্যঙ্গাত্মক, ‘খেলায় কৌশল ফলানোর ক্ষেত্রে পুরুষ ক্রিকেটারদের তুলনায় নারীদের পূর্ণপ্রস্তুতি (সাজসজ্জা) থাকে। নাকের উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে তাঁদের ব্যবহৃত কসমেটিকস দিয়ে বলের উজ্জ্বলতা কেড়ে নেওয়া যায়। এমনকি বলের পিচ্ছিলতাও মুছে ফেলা যায় তাঁদের মুখের পাউডার দিয়ে…মানবজাতির এই অর্ধেক প্রভাব–জাগানিয়ারা ছাড়া বয়োবৃদ্ধ পুরোনো ক্রিকেট আর কীভাবে জনপ্রিয় হবে?’
মেয়েদের টেস্ট ক্রিকেট মাঠে গড়িয়েছে সেই ঘটনার দুই বছর পর। এরপর তাঁদের ম্যাচে আর কখনোই চুইংগাম দিয়ে ‘বেলস’ আটকাতে হয়নি। তবে ‘বল টেম্পারিং’ করতে পুরুষ ক্রিকেটাররা চুইংগামের ওপর ভরসা রেখেছেন। ফাফ ডু প্লেসির সেই ঘটনা মনে আছে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: