Home » জাতীয় » দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে সবজি চাষ!!
দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে সবজি চাষ!!
দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে সবজি চাষ!!

দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে সবজি চাষ!!

খুলনার রুপসা স্ট্রান্ড রোডর প্রান্তরে ঢাকা ম্যাচ ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানি লিমিটেড একটি কারখান যার ইউনিট হচ্ছে দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি এবং পাশে বাঘ মার্কা দেশলাইয়ের একটি ছবির সাইনবোর্ড  দেওয়া আছে যেটা মরচে ধরে গেছে কিন্তু পড়তে তেমন সমস্যা হয় না।তবে  প্রথমে কারখানার ভিতরে প্রবেশ করার পথে তাকালে কারখানার কোনো আলামত , চোখেতো পড়বেই না, পড়বে সবজি চাষ করার দৃশ্য। যেখানে লাউ , শিম থেকে শুরু করে  বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষ হচ্ছে। এমনকি সেখানে দেখা যাবে কলাগাছও।

ম্যাচ ফ্যাক্টরির  সবজির বাগান রেখে আরেকটু সামনে হাঁটলেই দেখা মিলবে দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির মূল কারখানা ভবেএবং সেই কারখানার ভাঙা জানালার ভিতর দিয়ে তাকালেই দেখা যাবে যন্ত্রপাতির । কিন্তু এগুলোকে যন্ত্রপাতি হিসাবে চিহ্নিত করতে বেশ কষ্ট হবে কারণ ,অযথা পড়ে থাকতে থাকতে এর উপরে মরিচা ধরে যন্ত্রপাতিগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। আর তাইএগুলোকে যন্ত্রপাতির কঙ্কাল বলাটাই সঠিক। সামনে এগিয়ে যাওয়ার পর চার-পাঁচটি অকেজো গাড়ির দেখা মিলল যেগুলোর গায়ে  স্পষ্ট করে লেখা  আছে ঢাকা ম্যাচ ইন্ডাস্ট্রিজ।

এইরকম  চিত্র  বৃহস্পতিবার খুলনা শহরের রূপসা স্ট্র্যান্ড রোডের দাদা ম্যাচ কারখানায় গিয়ে  পাওয়া গেছে। দাদা ম্যাচ কারখানাটি গত ২০১০ সালের আগস্ট থেকে এখনও বন্ধ রয়েছে। তবে একসময় কিন্তু এখানে প্রজাপতি, জোড়া ঘোড়া, ট্যাক্সি, টাইগারসহ বিভিন্ন  ধরনের ব্র্যান্ডের দেশলাই উৎপাদন হতো। ১৯৫৫ সালে দাদা ম্যাচ কারখানাটি চালু হয় যা রূপসা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে ১৭ দশমিক ৭৯ একর জায়গার ওপর  প্রতিষ্টিত।

চারজন নিরাপত্তাকর্মী যারা এখনও বন্ধ মিলের অকেজো যন্ত্রপাতি ও সম্পদ পাহারা দিতেছেন কিন্তু  সাড়ে সাত বছর যাবত তাঁরা কোনো বেতন পাচ্ছেন না। এই নিরাপত্তাকর্মীদেরকে জেলা প্রশাসন থেকে মাসে  মাত্র ৩০ কেজি চাল দেওয়া হয়। নিরাপত্তাকর্মী আফজাল হোসেন বলেন কারখানাটি আবারও চালু হবে ,এরকম একটা আশাতেই এখানে আঁকড়ে আছি। ১৯৮২ সাল থেকে দাদা ম্যাচ কারখানায়  কাজ করছেন, এবং সেখানে তাঁরাই সবজির চাষ করছেন।

কারখানার সাবেক শ্রমিক যিনি মারা গেছেন সেই দেলোয়ার হোসেনের ছেলে হারুনুর রশীদ সাংবাদিক আসার কথা শুনে সেই কারখানায় হাজির হয়েছিলেন। সে তাদের কাছে বললেন যে প্রতিনিয়তেই মিলের যন্ত্রপাতি এপার ওপার হচ্ছে। কারখানার যন্ত্রপাতি যদি এভাবে হারিয়ে বা চুরি হতে থাকে তাহলে আগামি দু-এক বছরের মধ্যেই সব যন্ত্রপাতি চোরের পকেটে হাওয়া হয়ে যাবে। কারখানার যন্ত্রপাতি চুরি করা চোরকে ধরে অনেকবার  পুলিশের কাছেদেওয়ার পরও সমস্যার কোন সমাধান হয়নি। কারন চোর গুলো  জামিনের মাধ্যমে ছাড়া  পেয়ে পুনরায় চুরি  করে।

১৯৭৩ সালে দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি জাতীয়করণ হওয়ার পর বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)শিল্প মন্ত্রণালয় কতৃক  মিলটি পরিচালনার দায়িত্ব পায়।সেসময় কারখানার শ্রমিকের সংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই হাজার এবং তখন কারখানাটি বেশ ভালই  ছিল ।  বিসিআইসি ৩০ শতাংশ শেয়ার তাদের কাছে রেখে সুইডিশ এক কোম্পানির কাছে ১৯৮৪ সালে হস্তান্তর করে। পরবর্তী সময়ে সুইডিশ কোম্পানিটি ফ্যাক্টরি চালাতে অক্ষমতা প্রকাশ করলে এই মিলের মালিকানা ১৯৯৩ সালে ভাইয়া গ্রুপ পায়। তখন কারখানাটিকে লাভজনক   করতে অনেক পথ অবলম্বন করা হয়। এমনকি কারখানা থেকে শ্রমিক ও ছাঁটাই করা হয়।কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। আর তাই ভাইয়া গ্রুপ  ২০১০ সালে মিলটি  বন্ধ করে দেয়।

যখন কারখানাটি বন্ধ করা হয় তখন কারখানায় ৪৮৫ জন স্থায়ী ও দেড় হাজারের মতো বদলি শ্রমিক ছিলো। বিসিআইসি বন্ধ কারখানাটি  চালু করার জন্য ভাইয়া গ্রুপের সাথে অনেক আলোচনা করেও কোন কাজ হয়নি পরে তারা ব্যর্থ হয়ে আশা ছেড়ে দেয়। শিল্প মন্ত্রণালয় পরবর্তীতে ২০১১ সালে কারখানারটি অধিগ্রহণ করে নেয়।  কারখানাটি এখন জেলা প্রশাসনের অধিনে আছে।

কারখানাটি তিন শিফটের মাধ্যমে তাদের কাজ চালাত এবং প্রতিদিন ২০-২২ হাজার গ্রোস দেশলাই  যা (এক গ্রোসে ১৭২৪টি) দেশলাই উৎপাদিত হতো। এতাকিছুর পরেও কারখানার  চাহিদা মেটানো যেত না। কারখানা থেকে প্রতিদিন পাঁচ-ছয় ট্রাক দেশলাই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেত। তবে বন্ধের আগে দিনে চার থেকে পাঁচ হাজার গ্রোস দেশলাই উৎপাদিত হতো,এসব তথ্য তখনকার কারখানার নিরাপত্তাকর্মী আফজাল হোসেন জানিয়েছে।

দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি বন্ধ হওয়ার পরেও ২৬৩ কোটি টাকা দেনা আছে যার মধ্যে শ্রমিকদের মজুরি বাকি আছে  প্রায় ছয়-সাত কোটি টাকার মত। তাই শ্রমিকরা তাদের দেনা আদায়ের জন্য এখনো ৯০টি শ্রমিক পরিবার  কারখানার কোয়ার্টারে বসবাস করছে। এদিকে বিদ্যুৎ বিলের  প্রায় ৫৬ লাখ টাকা পরিশোধ না করায় গত দেড় বছর ধরে পুরো কারখানা চত্বর ও কোয়ার্টার অ আলোহীন অবস্থায় আছে। আর এ কারনে পানির পাম্পও চলছে না।

১৯৯৪ সাল থেকে মতিউর রহমান ভাইয়া গ্রুপের কারখানায় কর্মরত আছেন। সরকার  সবকিছু অধিগ্রহণ করলেও তিনি এখনও আছেন।  তিনি বললেন, ‘বেতন বাবদ আমি চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পাবো। আর এ টাকা পরিশোধ করলেই আমরা চলে যাব। শ্রমিকেরাও বকেয়া মজুরি পেলে কোয়ার্টার ছেড়ে দেবেন।’ তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ-পানির অভাবে কারখানার শ্রমিকেরা পরিবার কারও কোনো মাথাব্যথা নেই।

কারখানাটি চালু করার বিষয়ে মতিউর রহমান বলেন,  ২০১৩ সালে সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বিসিআইসিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।অবশ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি।বর্তমান শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে এসে বন্ধ মিল চালুর বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু  ফ্যাক্টরির নিয়ে অমানবিক জীবন যাপন করছেন। কেউ  এ ব্যাপারে কেউ দায়দায়িত্ব নিচ্ছে না এবং সাবেক মালিকপক্ষ মামলা করার  কারনে বিষয়টি  জটিলত হয়ে গেছে বললেন শিল্পমন্ত্রী।

খুলনার জেলা প্রশাসক মো. আমিন উল আহসান গত শনিবার বলেন,  ‘দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি জেলা প্রশাসন এর আওতায় রয়েছে।তবে বিসিআইসি কোনো বরাদ্দ দেয় না।সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে কারখানাটি ব্যবহারের জন্য আমরা আইটি পার্ক অনেকবার চিঠি দিয়েছি কিন্তু কোন কাজ হয়নি। তিনি আরও বলেন, ‘কারখানার সাবেক শ্রমিকের পাওনা, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ, টাকা পয়সা পরিশোধসহ রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও বিসিআইসিকে অনুরোধ করেছি। তবে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: