Home » অর্থনীতি » পেয়াজের ঝাঁঝে কাতর বাঙ্গালী
পেয়াজের ঝাঁঝে কাতর বাঙ্গালী
পেয়াজের ঝাঁঝে কাতর বাঙ্গালী

পেয়াজের ঝাঁঝে কাতর বাঙ্গালী

পেঁয়াজ ছাড়া  দৈনন্দিন জীবন ভাবাই যায় না। তাই পেঁয়াজের দাম বাড়লে গণমাধ্যমে এবং জনগণের মাঝে একটা হৈচৈ পড়ে যায়। পেঁয়াজের  দাম নিয়ে গত বছরের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত  যে কতবার  সংবাদ শিরোনাম হয়েছে, সেটা হুট করে বলা মুশকিল। পেঁয়াজের দাম এখন কিছুটা কমেছে। পুলিশের অপরাধ সংক্রান্ত একটি তদন্ত বিভাগের ইকোনমিক ক্রাইম ইউনিট পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির কারণ পর্যবেক্ষণ  করছেন। পুলিশের এই পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে  প্রকাশ পেয়েছে যে- পেঁয়াজের দাম বাড়ানো হয়েছে পরিকল্পনা করেই, বিশ্ববাজারে  পিয়াজের দাম বৃদ্ধি ও দেশীয় বাজারে  পেয়াজের জোগান কম থাকার কারনে নয়।

ভোক্তারা  কোন কোন সময়  আমদানি মূল্যের দ্বিগুণ দামে পেঁয়াজ কিনতে বাধ্য হয়েছেন। পিয়াজের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একশ্রেণির ব্যবসায়ী পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মজুদও গড়ে তোলেন। মাঝখান থেকে কোটি কোটি টাকা আত্যস্বাদ করেছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা। সিআইডির একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এসব তথ্য জানায়।

বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসু বলেন,পুলিশের নিকট থেকে প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তিনি আরও বলেন অনেক সময় অতি লোভের আশায় বাড়ানো হয়েছে দাম।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, হঠাৎ করে পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণ অনুসন্ধান করে সিআইডি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে এবং সেই সাথে দেশের চারটি বন্দরের মাধ্যমে পেঁয়াজ আমদানির রেকর্ড ও দাম  নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।  আমদানি মূল্যের সঙ্গে খুচরা বাজারে পিয়াজের দামের এতো বিশাল ফারাকের কি কারণ,সেব্যাপারে যুক্তিসংগত কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি ব্যবসায়ীরা।

সিআইডির দায়িত্বশীল পক্ষ জানায়,  পিয়াজ আমদানির রেকর্ড জানতে প্রথমে তারা বেনাপোল, হিলি, সোনামসজিদ ও ভোমরা বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়। গত এক বছরে তাদের বন্দরের মাধ্যমে কী পরিমাণ পেঁয়াজ কী দামে কারা আমদানি করেছে, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল।

হিলি বন্দর থেকে পাওয়া প্রতিবেদন অনুসন্ধান করে দেখা যায়, জুলাইয়ে ভারত থেকে আনা পিয়াজের বেশিরভাগ চালানে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম পড়েছে ১০ থেকে ১৩ টাকা। আগস্টে আমদানি করা প্রতি কেজি পিয়াজের সর্বনিম্ন দাম পড়ে ১১ টাকা। ওই মাসে কিছু চালানের প্রতি কেজি পেঁয়াজের সর্বোচ্চ দাম পড়ে  ৩৯ টাকা। তবে আগস্টে আসা অধিকাংশ চালানের প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম পড়ে ১২ টাকা। সেপ্টেম্বরে ভারত থেকে আসা প্রতি কেজি পেঁয়াজের গড় মূল্য ছিল ১২ থেকে ২৫ টাকার ভেতরে। তবে ওই মাসে বেশিরভাগ চালানের প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ছিল ২২ ও ২৫ টাকা। গত অক্টোবরে ভারত থেকে কেনা প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম পড়ে ২০ থেকে ৩৩ টাকার ভেতরে। তবে বেশিরভাগ পেঁয়াজের দাম প্রতি কেজিতে ছিল ২৫ টাকা। নভেম্বরে এসে প্রতি কেজি পেঁয়াজের গড় দাম ছিল ২৫ থেকে ৪১ টাকা। তবে ২৫ নভেম্বরের পর কিছু চালানের পেঁয়াজের দাম পড়ে প্রতি কেজি ৭১ টাকা।

তথ্য অনুসন্ধানকারিরা বলছেন, বন্দরে পেঁয়াজের চালান আসার পর সরকারি কিছু খরচসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় বাবদ প্রতি কেজিতে আরও এক টাকা খরচ বেশি হয় আমদানিকারদের। এ ছাড়া এসব পেঁয়াজ বন্দর থেকে রাজধানী পর্যন্ত আসতে কেজি প্রতি আরও এক থেকে দেড় টাকা খরচ হয়ে থাকে। এর পর আমদানিকারকরা পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে এসব পেঁয়াজ বিক্রি করেন। পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তা খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে। সব মিলিয়ে ভারত থেকে আমদানি করার পর তিন-চার হাত হয়ে পেঁয়াজ ভোক্তার কাছে পৌঁছে।

সিআইডির পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্তকালে পেঁয়াজ আমদানির সঙ্গে সংশ্নিষ্ট দেশের একাধিক ব্যবসায়ী পুলিশের কাছে জিজ্ঞাসাবাদে অকপটে স্বীকার করেন, কোনোভাবেই বাজারে পেঁয়াজের এই অগ্নিমূল্য হওয়ার কথা নয়।

তারা বলছেন, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরাই ভোক্তাদের পকেট কাটছেন। সব খরচসহ প্রতি কেজি পেঁয়াজে দুই টাকা করে লাভ করার লক্ষ্য থাকে তাদের। এ হিসাবে গত বছরের জুলাইয়ে ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম হওয়ার কথা সর্বোচ্চ ১৬ থেকে ১৮ টাকা। আগস্টে দাম হওয়ার কথা ছিল ১৭-১৮ টাকা। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ২৫-২৬ টাকা। সেপ্টেম্বরে ৩০-৩২ টাকা, অক্টোবরে ৩০-৩২ টাকা এবং নভেম্বরে ৫০ টাকা।

২৫ নভেম্বরের পর থেকে কিছু ক্ষেত্রে দাম হওয়ার কথা প্রতি কেজি ৮০ টাকা। তবে খুচরা বাজারে নভেম্বরে দেশি পেঁয়াজের দাম ছিল প্রতি কেজি ৭৮-৮০ টাকা, ভারতীয় পেঁয়াজ ৫৪-৫৮ টাকা। অক্টোবরে দেশি পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৭৫-৯৫ টাকা এবং ভারতীয় পেঁয়াজ ৭০-৮০ টাকা।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সিআইডির একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, আগস্টে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। এর পর থেকে পেঁয়াজের দাম কমার কথা ছিল। কিন্তু ওই মাসের পর দাম আরও বাড়তে থাকে। তদন্তে উঠে এসেছে, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আগস্টে বেশি চালান আসার পর তা মজুদ করে ফেলেন ব্যবসায়ীরা। এরপর বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হয়।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, বছরে দেশের চাহিদার সিংহভাগ পেঁয়াজ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হচ্ছে। বছরে ১৭-১৯ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। বাকি চাহিদা আমদানিতে মিটছে। আমদানির প্রধান বাজার ভারত থেকে অধিকাংশ পেঁয়াজ আসে। গত বছরে ৭ থেকে ১১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়।

এ হিসাবে দেশে পেঁয়াজের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকার কোনো সুযোগ নেই। তবে প্রায়ই পেঁয়াজের সরবরাহ ঘাটতির কথা বলে হঠাৎ দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এখন রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজারে গড়ে প্রতি কেজি দেশি ছোট পেঁয়াজ ৬৫-৭৫ টাকা ও বড় পেঁয়াজ ৮০-৮৫ টাকা এবং আমদানি করা পেঁয়াজ ৬০-৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সিআইডি বলছে, এখন পর্যন্ত তারা পেঁয়াজ আমদানির সঙ্গে জড়িত দেশের অন্যতম প্রধান চারটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য ডেকেছে। তাদের মধ্যে খুলনার হামিদ এন্টারপ্রাইজের আবদুল হামিদ ও বেনাপোলের জেবিসি ট্রেডার্সের ম্যানেজার মিহির মুখার্জি ঢাকায় সিআইডি কার্যালয়ে এসে তাদের মতামত উপস্থাপন করেছেন। গত বছর হামিদ এন্টারপ্রাইজ নয় হাজার টন ও জেবিসি ট্রেডার্স দুই হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি করেছে। তারা সিআইডির কাছে বলেছেন, আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে ভোক্তার নিকট যাওয়া পর্যন্ত দামের যে পার্থক্য, এটা অমানবিক। তাদের দাবি, পােইকারি ব্যাবসায়ী ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কারণেই পিয়াজের এতো দাম বেড়েছে।

পেঁয়াজের দাম বাড়ার পিছনে যেসব আমদানিকারক, পাইকারি  ও খুচরা ব্যবসায়ী যারাই জড়িত, তাদেরকে ঠিক করা হয়েছে। ধারাবাহিক ভাবে তাদের বক্তব্য নেওয়া হবে এবংতাদের কথা সন্তোষজনক না হলে ফৌজদারি আইনে মামলা হবে।

সিআইডির পর্যালোচনায় পেঁয়াজের দাম বাড়ার পেছনে সকল প্রকার তথ্য ধরা পড়েছে। এখন সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে আলোচনার পর জড়িতদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা দেওয়া হবে একথা বলেছেন, সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুপার রফিকুল ইসলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: